ফিলাডেলফিয়া রহস্য : পর্ব ১
অচেনা আগন্তুক
১৯৭০ সাল। কলোরাডোর স্প্রিং শহরের ওয়ার মেমোরিয়াল পার্কে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের এয়ারফোর্সের দুই এয়ারম্যান জেমস ডেভিস আর অ্যালেন হিউজ। হাতে ক্যামেরা। সন্ধ্যা নেমেছে, আকাশে রক্তিম চাঁদ।
হিউজ চাঁদের ছবি তুলতে শুরু করলেন।
তখন হঠাৎ এক ভবঘুরে টাইপের লোকের আবির্ভাব। উষ্কু-খুস্কু চেহারা, মলিন ময়লা কাপড়, চোখে একরাশ হতাশা। ডেভিস একটু আগে দেখেছেন লোকটাকে পার্কের মনুমেন্টের আশপাশে ঘোরাফেরা করতে।
তারা ভেবেছিলেন লোকটা হয়তো ভিক্ষুক, এসেছে ডলার চাইতে। কিন্তু সেই লোক ডলার বা নিজের ব বর্তমান অবস্থার কথা কিছুই বললেন না। তার বদলে শোনালেন আশ্চর্য এক গল্প।
লোকটা জানালেন যুদ্ধের সময়- মানে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি নৌবাহিনীতে ছিলেন।
সেখানে তিনি এক অদ্ভুত আচরণের শিকার হয়েছিলেন, তারপর তাকে মাথাখারাপের ধুয়া তুলে অনেক দূরে নির্বাসন দেওয়া হয়। কিন্তু লোকটা দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করেন, তিনি পাগল নন, তাকে বলির পাঠা বানানো হয়েছে। আর মাথায় যদি কিছু গোলমাল হয়েও থাকে, তাহলে সেই অভিশপ্ত এক্সপেরিমেন্টের প্রভাবেই হয়েছে। তবে নিজেকে পাগল বলতে একদমই নারাজ সেই লোক।
কে তিনি?
ডেভিসকে একটা আইডিকার্ড দেখান লোকটা, নৌবাহিনীর আইডি।
ডেভিস তখন উৎসাহী হন, জানতে চান কী ধরনের এক্সপেরিমেন্টের কথা লোকটা বলছে, সেটার পরিণতিই বা কী হয়েছিল?
লোকটা তখন সেই আশ্চর্য এক্সপেরিমেন্টের কথা শোনালেন, যে এক্সপেরিমেন্টে আস্ত একটা জাহাজকে অদৃশ্য করা হয়েছিল, সেখানকার নাবিকদেরসহ।
কীভাবে? জানতে চাইলেন ডেভিস। লোকাটা জানান, ভয়ানক এক চূম্বকক্ষেত্র তৈরি করে। এতটাই শক্তিশালী চুম্বকক্ষেত্র নাবিকরা সেটার প্রভাব সহ্য করতে পারেননি। মস্তিস্কবৈকল্য দেখা দেয় তাদের। কেউ কেউ কিছুক্ষণের মধ্যেই মারা পড়েন, বাকিরা বেঁচে থাকলেও সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনে আর ফিরতে পারেননি।
কীভাবে এই পরীক্ষা করা হলো, বিস্তারিত জানতে চান ডেভিস। ওটা ছিল একটা বিদ্যুৎচুম্বকীয় ধুম্রজাল। জাহাজকে ঘিরে সেই বিদ্যুৎচুম্বকীয় ক্ষেত্র তৈরি করা হয়। ফলে সেই চুম্বক্ষেত্রের ভেতর থেকে আলো বেরিয়ে আসতে পারে না, তাই কিছুক্ষণের জন্য হলেও জাহাজটা গায়েব হয়ে যায়।
কিন্তু এটা আমাদের জন্য মারাত্মক পরিণাম ডেকে এনেছিল, ব্যাখ্যা করেন আগন্তুক। কেউ একটা জিনিস দুটো করে দেখতে লাগল, কেউ কেউ বিনা কারণে হেসে গড়িয়ে পড়ছিল, কেউ কেউ অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিল। কেউ কেউ অসংলগ্ন কথাবার্তা বলতে শুরু করল, জানাল, কিছুক্ষণের জন্য চলে গিয়েছিল ভিন্ন এক জগতে, সেখানে নাকি সাক্ষাৎ হয়েছিল আজব সব প্রাণীর সঙ্গে। কেউ কেউ নাকি মারাও পড়েছিল সঙ্গে সঙ্গে, তবে এ ব্যাপারটা নিশ্চিত করতে পারেননি আগুন্তুক। তবে যারা বেঁচেছিল তাদের পেনশন দিয়ে চাকরিচ্যূত করা হলো। তবে তার আগে কিছুদিন জনবিচ্ছিন্ন করে রাখা হলো তাদের। সে সময় কর্তৃপক্ষ তাদের বলে, আসলেই তোমাদের মস্তিষ্কবিকৃতি হয়েছে, জাহাজ অদৃশ্য হওয়ার ব্যাপার নিয়ে যা বলছ, তা কখনোই ঘটেনি। এ সব আর বলো না। এমনকী তাদের নাকি শপথও করিয়ে নেওয়া হয়েছিল, এ ব্যাপারে যাতে মুখ না খোলে।
লোকটা বলে, জানি আপনারা আমার কথা বিশ্বাস করবেন না আপনারা, অন্যরাও করবে না, কারণ নৌবাহিনী কর্তৃপক্ষ ব্যাপারটা এভাবেই সাজিয়েছে। আমাদের মানসিক বিকারগ্রস্ত বলে চাকরিচ্যূত করা হয়েছে। কেউ যদি এ গল্প নিয়ে খোঁজখজবর করে, কর্তৃপক্ষ সহজেই তাদের বোঝাতে পারবে, একদল পাগলের কথা বিশ্বাস করে গল্প বানাচ্ছে, মানসিক অসুস্থতার জন্য যাদের ছাঁটাই করা হয়েছে!
এরপর লোকটা প্রসঙ্গ পাল্টান, সাধারণ কথাবার্তা বলতে শুরু করে। হিউজ অবশ্য এই কথপোকথনের পুরোটা শোনেনিন, ছবি তোলায় ব্যস্ত ছিলেন বলে। তবে সারমর্মটুকু ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু লোকটার কথা বিশ্বাস করবেন না অবিশ্বাস করবেন, তা নিয়ে দোলচালে ছিল দুজনই।
কিছুক্ষণ পরে লোকটা বিদায় নেন। ডেভিস আর হিউজও চলে আসেন বিমান ঘাঁটিতে। পরবর্তী কয়েকমাস দুই এয়ারম্যান বার বার নিজেদের মধ্যে ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করেছেন, কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি।
এর কিছুদিনের মধ্যে ডেভিসকে বিমানবাহিনী থেকে ছাঁটাই করা হলো, হিউজকে বদলি করিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হলো অন্য কোথাও।
চলবে...
অনলাইন ডেক্স : ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৪
0 Comments